কোনো এক ভোরে || সোহরাব শান্ত ||

প্রিয়তোষ বাবুর ঘুম আসে না। অনেক চেষ্টাতেও না। রাতের পর রাত তিনি ঘুমানোর চেষ্টা করেন। ঘুমের ওষুধ খেয়ে খেয়ে বিরক্ত। অনেক দিন হলো তা বন্ধ করে দিয়েছেন। ভোর রাতে বারান্দায় বসে থাকেন তিনি। অনেক সময় নিয়ে সিগারেট টানেন। পাখির কলকাকলি শুরু হলে বিছানায় যেতে ইচ্ছে হয়। তখন বিছানায় গা এলিয়ে দিলে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেন।

অদ্ভুত এক অভ্যাস!

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা প্রিয়তোষ বাবুর স্ত্রী মিতা। বছর দুয়েক হলো ভীষণ অসুস্থ। গভীর ঘুমে মগ্ন স্ত্রীকে বিছানায় রেখে তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। একটা সিগারেট জ্বালাবেন। ঠোঁটের কোণায় সিগারেট চেপে ধরা। লাইটারটা হাতে নিয়েও থেমে গেলেন তিনি। আগুন ধরানো হলো না। ভোর হয়ে আসছে। অবসর জীবনের আগের সময়টা মনে পড়ে তার।

প্রিয়তোষ বাবুর ঘুম ভাঙতো ঘড়ির এ্যালার্মে। টেলিভিশনে টক শো দেখার বদ অভ্যাস তার। মাঝরাতে বিছানায় গিয়ে ভোরে জেগে ওঠা কঠিন। তাও উঠতে হতো। সূর্যের তেজ বাড়ার আগেই অফিসের গাড়ি এসে দাঁড়াতো বাড়ির সামনে। ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন স্ত্রী মিতা। প্রায়ই মিতার কপালে আলতো একটা চুমু এঁকে দিতেন তিনি। কাজটা করতেন অভ্যাসবশত। অবসরের আগের দিনগুলোতেও। মন যদি তরুণ থাকে, বয়সে কী এসে যায়!

মিরপুর থেকে মতিঝিল। দুরত্ব আহামরি কিছু নয়। তাও অনেক দূর। কোনো একটা সড়কে ট্রাফিক জ্যাম শুরু হলো তো সারা রাজধানীতে গাড়িগুলোর ধুকে ধুকে চলা। এভাবেই কষ্ট করে দিনের পর দিন অফিস করতে হয়েছে তাকে। অর্ধমৃত এই ঢাকা শহরটায় মানুষ থাকে কী করে! প্রিয়তোষ বাবু নিজেকেই নিজে মনে মনে টিজ করেন। ‘হায় রে প্রিয়তোষ, ক্যান যে এই ঢাকা শহরে মরতে আসলা!’

প্রিয়তোষ বাবু ঢাকায় কোনো বাড়ি করতে পারেন নি। এই ফ্ল্যাটটা কিনেছেন বছর সাতেক হলো। গাড়ি কিনতে পারতেন। ছেলে দুইটার পেছনে টাকা ঢালতে ঢালতে তা আর হয়ে উঠলো না।

দুই ছেলে এখন দেশের বাইরে। একজন সুইডেনে। অন্যজন কানাডায়। প্রিয়তোষ বাবু জানেন, ছেলেরা ভালই টাকা-পয়সা কামান। কিন্তু দেশের বাইরে গেলে কে আর বৃদ্ধ বাবা-মা`র খোঁজ রাখে! নাকি সুরে তিনি গান ধরেন-

ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার

মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার

নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী

সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি…

প্রিয়তোষ বাবু গানটা শেষ করেন না। দম বন্ধ হয়ে আসে। স্ত্রীর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কাও গান থামানোর অন্যতম কারণ। গান বন্ধ করে তিনি মনে মনে হাসেন।

নিজের কৃষক বাবাকে গ্রামে রেখে ঢাকার ফ্ল্যাট বাড়িতে জৌলুসপূর্ণ জীবন কাটিয়েছেন তিনি। এখন তার ছেলেরা থাকছে দেশের বাইরে। যুগের বদলের সাথে সাথে সবাই একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। ভালো-মন্দ, দুই ব্যাপারেই। ইস্, ক্যান যে মানুষ শুধু ভালো বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিযোগিতা করে না!
আচ্ছা, এ কী শুধুই প্রতিযোগিতা? নাকি পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া!

প্রথম প্রথম ছেলেদের উপড় মন খারাপ হতো পরিতোষ বাবুর। ঘেন্না লাগতো। মনে হতো দুইটা অমানুষ জন্ম দিয়েছেন তিনি! নইলে উন্নত দেশের চাকচিক্য মা-বাবাকে ভুলিয়ে দিতে পারে? একসময় এই অভিযোগ থেকে সরে আসেন তিনি। নিজেকে দিয়ে তুলনা টানেন। গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসার সময় তার বাবা-মাকে কী বলেছিলেন!

বাবা-মা আশায় ছিলেন, ছেলে পড়াশোনা শেষ করে গ্রামে ফিরবে। কিন্তু প্রিয়তোষ বাবু তো গ্রামে ফিরতে পারেন নি। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পারেন নি। শেষ বয়সে বাবা-মাকে সঙ্গ দিতে চেয়েও পারেন নি।

বারান্দা থেকে সামনের বাগানবিলাস গাছটা কাছে। দু’তলার এই ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। মাঝে মাঝে গাছটার পাতা ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পাতাগুলোর দিকে হাত বাড়ান না। কেন যেন হয়ে ওঠে না। আজ খুব ইচ্ছে করছে, কোনো একটা পাতার গায়ে হাত বুলাতে।

গাছটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাঁকান প্রিয়তোষ। না, কেউ দেখছে না। কাজের মেয়েটা ছুটি নিয়ে গ্রামে গেছে। অসুস্থ স্ত্রী ঘুমুচ্ছেন। মানুষটার এই এক সুবিধা। সাধারণত অসুস্থ মানুষ কম ঘুমায়। মিতা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে প্রচুর ঘুমান।

প্রিয়তোষ বাবু ধীরে ধীরে হাত বুলান বাগানবিলাস গাছের পাতাগুলোয়। আবছা অন্ধকারে রঙিন পাতাগুলো আলাদা করা যায় না। পাশের মসজিদ থেকে মোয়াজ্জিনের সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসে।

‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার
আশহাদু আল্লাহ ইলাহা ইল্লাল্লাহ…’

প্রিয়তোষ বাবু কেঁপে ওঠেন। আজানের ধ্বনি মধুর লাগছে। তার মাথায় আজানের প্রতিটি শব্দ ধাক্কা দেয়। মধুর ধ্বনির কী শক্তি! তিনি আজানের পুরো অর্থ বোঝেন না। তবে ‘আল্লাহু আকবার’ শব্দের মানে বোঝেন। পরিতোষ বাবুর মনে হলো সত্যিই তো ‘ঈশ্বর মহান’। গড, ঈশ্বর, আল্লাহ, স্রষ্টা, বিধাতা; যে নামেই ডাকা হোক, এক সত্তাকেই তো সবাই স্মরণ করে।

পরিতোষ বাবু এই ভোরে অন্যরকম শান্তি অনুভব করছেন। বারান্দার পাশঘেঁষা কয়েকটা পাতাবাহার চেপে ধরে তিনি চোখ বন্ধ করেন। বন্ধ চোখের কোণে জমেছে জল।
দাঁড়োয়ানের হাকডাকে ধ্যান ভঙ্গ হয়।

‘স্যার, আফনে নি বারান্দায়। দেহেন তো স্যার এই আকামডা কেডা করছে? আমি তো আইন্ধারের মইধ্যে দেইখা ডরাই গেছিলাম। ককটেল-মকটেল হইতে পারে মনে কইরা এতক্ষণ কাছেও যাই নাই।’

‘তাই নাকি! এত ভয় নিয়ে রাতে ডিউটি করো!’ কোমল কণ্ঠে দারোয়ানের সঙ্গে রসিকতা করেন পরিতোষ বাবু।

আবছা অন্ধকার কেটে গিয়ে এখন চারপাশ আলোকিত। পরিতোষ বাবু বারান্দা থেকে তাকান। দারোয়ানের হাতে ছোট একটা মরিচ গাছ। লাল একটা টিনের কৌটায় ভরা মাটিতে রোপণ করা। গাছটা ছোট হলেও পাতাগুলো চমৎকার। সবুজ। হতে পারে, পাশের কোনো ফ্ল্যাট থেকে বাচ্চারা ফেলে দিয়েছে।

পরিতোষ বাবুর মনে হলো, মরিচ গাছটাকে বাঁচানো উচিৎ। ঈশ্বরের সৃষ্টিকে এভাবে অবহেলা করা যায় না। তার মন ছুটে যায় গ্রামে। ছোটবেলার সবুজ মাঠে-ছোট পুকুরে মুহুর্তেই যেন পা পড়ে তার।

প্রিয়তোষ বাবুর বাবা-দাদা ছিলেন সম্ভ্রান্ত কৃষক। গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু- সবই ছিল তাদের। বাড়িজুড়ে ছিল কত রকমের গাছ! ঢাকায় এই সবুজ এখন পাওয়া যাবে? চাইলেও আর গ্রামে ফেরা যাবে না। এই সবুজকে প্রাণভরে উপভোগ করা যাবে না। বাবা মারা গেছেন বছর তিনেক হলো। গ্রামের জায়গা-জমিও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখন তিনটা মুসলমান পরিবারের বাস।
পরিতোষ বাবু দারোয়ানকে ডাকলেন, ‘আক্কাস, মরিচ গাছটা নিয়ে দু’তলায় আস’। তারপর তিনি বারান্দা থেকে ফ্ল্যাটের মূল দরজার দিকে এগুলেন।

আক্কাসকে দেখা গেলো নিজের জায়গাতেই থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। স্যার কি সত্যিই মরিছ গাছ নিয়ে দু`তলায় যেতে বললেন! নাকি ভুল শুনেছে সে! তার মনে দ্বিধা।

রোদের তেজ বাড়ার আগেই স্নান সেরে বারান্দায় এসে বসলেন পরিতোষ বাবু। একপাশে টবে লাগানো মরিচ গাছ। আক্কাসকে দিয়ে নিচে পড়ে থাকা একটা পুরনো টব এনে, এতে মরিচ গাছটা লাগানো হয়েছে। পরিতোষ বাবুর মন এখন ফুরফুরে। সকালের হালকা বাতাসে মরিচ গাছের পাতাগুলো দুলছে। পরিতোষ বাবুর মনটাও দুলছে আনন্দে। এতদিনের চাপা কষ্টগুলো যেন ছুটিতে চলে গেছে! তিনি মনে মনে পরিকল্পনায় ব্যস্ত।

মরিচ গাছটার গোরায় বিকেলে পানি দিতে হবে। পোকামাকড়ের আক্রমণ হলো কিনা খেয়াল রাখতে হবে। শহরে গোবর পাওয়া যাবে না। তাই কিছুদিন পর পর সার দিতে হবে। এই সেরেছে, ঢাকার কোথায় সার পাওয়া যায়, তা তো তিনি জানেন না! সমস্যা নেই, নার্সারিগুলোতে গেলে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

মিতা বাড়ৈ ঘুম থেকে জেগে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি স্বামীর দেহ-মনের প্রশান্তি ভাব দেখে বিস্মিত। মরিচ গাছটার দিকে চোখ পড়তে তার মুখেও একটু হাসির আভা খেলে গেল। পরিতোষ বাবু তার হাতটা ধরার পর একটু কেঁপে উঠলেন মিতা বাড়ৈ। তরুণ বয়সে কতনা মুধুময় ছিল তাদের দাম্পত্য জীবন!

লাইক দিয়ে শেয়ার করুন
0
madhabdi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *