মাধবদী বাবুরহাটের বস্ত্র শিল্প

এমদাদুল ইসলাম খোকন

আর্য-অনার্যদের পর এই ভারতবর্ষে মৌর্যরা অনেকদিন দেশ শাসন করে। বিশাল মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল তখন কয়েকটি ভূক্তিতে বিভক্ত। মন্ডল, ভুক্তি, বীথি ছিল নাম। নারায়নগঞ্জ, নরসিংদীর কিছু অংশের নাম ছিল ‘সুবর্ণবীথি’। এই সুবর্ণ বীথির প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং বাণিজ্য বন্দর ছিল সোনার গাঁও। সোনারগাঁওয়ের নামও ছিল ‘সুবর্ণ বীথি’। সুলতানী আমল, বারো ভূঁইয়াদের সময় এলাকার নাম হয় “মহেশ্বরদী পরগণা”। ‘আর্য’ যুগ ও ‘মৌর্য’ যুগে বিক্ষিপ্তভাবেই আমাদের এই পূর্ব বঙ্গ শাসিত হতো। গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীন জনপদগুলো বিলুপ্ত হয়। সমুদ্রগুপ্তের সময় অনেক এলাকা তার অধীন ছিল। কিছু সংখ্যক গুপ্তযুগীয় তা¤্রশাসন থেকে জানা যায় যে, রাজধানী পুন্ডনগরসহ সমস্ত উত্তরবঙ্গ খ্রিষ্ট্রীয় ৬ষ্ট শতাব্দী পর্যন্ত গুপ্ত শাসনাধীন ছিল।

বর্হিবিশ্বের অনেক দেশের বাণিজ্য তরী সওদা নিয়ে যেত সুবর্ণগ্রামে। সেখান থেকে উজান বেয়ে বণিকেরা যেতো নরসিংদী। তারপর সেখান থেকে তারা যেতে উয়ারী বন্দরে। বণিকেরা দিয়ে যেতো ধাতব নির্মিত তৈজসপত্র। আর তারা নিয়ে যেতো এখানকার বৈচিত্র্যময় শস্য সামগ্রী। কেনা-বেচা শেষে বিদেশী বণিকেরা মেঘনার পথে পাড়ি জমাত সমতটের রাজধানী ময়নামতির উদ্দেশ্যে। তবে “উয়ারী বটেশ্বরই” যে আদি সভ্যতা, এখানেই বাণিজ্য বন্দর ছিল- একথা এখন পরিষ্কার।
গ্রিক নাবিক সালোফ্রিস পান্দিত্তন, মার্কাস এরা পূর্বেই উয়ারী বটেশ্বরের নাম শুনেছিল আরব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। তখন এ এলাকায় মিহি কাপড় তৈরী হতো- যা বণিকদের ছিল পছন্দের। এছাড়া, হস্ত কুঠার, দা ছেনি বানাতো এ এলাকার পরিশ্রমী লোকজন।

শেষ মৌর্য স¤্রাট বৃহদান্ধের মৃত্যুর পর করতোয়া ও যমুনা নদীর (প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা) পূর্ব তীরে পাশাপাশি দু’টি স্বাধীন স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় এর একটি প্রাচীন ‘ডবাক’ অপরটি ‘সমতট’। পন্ডিতদের ধারণা যে মেঘনা নদীর পূর্ব তীরে কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট ও ময়নামতিকে কেন্দ্র (রাজধানী) করে গড়ে উঠেছিল সমতট রাজ্য। আর মেঘনা নদীর পশ্চিম তীর থেকে করতোয়া ও যমুনা নদীর পূর্ব তীরের ভূখন্ডে আধুনিক ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন ‘ডবাক রাজ্য’। ডবাক রাজ্যের রাজধানী ছিল ‘ডবাকা’। প্রাচীন রাজধানী ডবাকার রূপান্তরিত নামই আজকের ঢাকা। তবে ভীনসেন্ট স্মিথ বলেন- ডবাক উত্তর বঙ্গে অবস্থিত। কেউ কেউ বলেন, আমাদের কপিলা নদীর উপত্যকায় “ডবোক” নামে একটি জায়গায় নাম আছে। যে যাই বলুক, একাধিক নাম থাকলেও ‘ডবাক’ রাজ্য যে ঢাকায় বৃহৎ জায়গা নিয়ে পরিচিত ছিল তা নিশ্চিত। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিছু অংশও “ডবাক “রাজ্যের অর্ন্তভুক্ত থাকতে পারে।
মৌর্য যুগের অনেক পর মোগল আমলে সোনারগাঁর অধীন এই মহেশ্বরদী পরগনার উত্তরাঞ্চল তথা নরসিংদী জেলা কাúাসিয়া, রূপগঞ্জ প্রভৃতি স্থানগুলো এবং কথিত ‘‘ডবোক’’ রাজ্যেই ছিল মসলিনের কারিগর।

অতিসম্প্রতি নরসিংদীর প্রতœনিদর্শন আবিষ্কার হওয়ায় ধারনা করা যায় মৌর্য যুগেও এখানে কাপড় বুনন হতো। তবে কী প্রক্রিয়ায় হতো তা আন্দাজ করা কঠিন। সাংবাদিক এ. কে ফজলুল হক লিখেনÑ ‘‘ জেলা হিসেবে নরসিংদীর বয়স খুব বেশী না হলেও নরসিংদীর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, হাড়িধোয়া, প্রাচীন গঙ্গাজ্ঞলি, কলাগাছিয়া ও কয়রা নদী জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য ছাড়াও নরসিংদী বাসীর রয়েছে সর্বনি¤œ দশ হাজার বছরের মানব বসতীর ইতিহাস এবং আড়াই হাজার বছরের নাগরিক সভ্যতার ইতিহাস। সভ্য মানুষ হিসেবে নরসিংদীতে কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয়ে প্রস্তর যুগ বা কৃষি যুগ থেকে। সুতার ব্যবহার না থাকলেও তালপাতা বা এ জাতীয় পাতার মাধ্যমে লজ্জানিবারণের জন্য কাপড় জাতীয় পণ্য তৈরী করে ব্যবহার করত। সময়ের বিবর্তনে পত্র নির্মিত পরিধেয় পণ্য থেকে আধুনিক যুগের রকমারী বাহারী ডিজাইনের পোষাকের সৃষ্টি।’’

নরসিংদীতে বস্ত্র উৎপাদনের কাল নির্ণয় বা বস্ত্র উৎপাদনের প্রাচীন পদ্ধতি কি ছিল তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব। প্রাচীন সভ্যতার সুতিকাগার মিশর। মিশরীয়গণ কর্তৃক নির্মিত পিরামিডে সংরক্ষিত মমিগুলো মসলিন কাপড়ে ঢাকা ছিল। ইতিহাস প্রমাণ করে বাংলাদেশের প্রাচীন সৌনাগড়া বা সুবর্নগ্রামে বিশ্ববিখ্যাত মসলিন কাপড় তৈরী হতো।

নরসিংদীতে সুতার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় তা¤্রযুগের বা নব্য প্রস্তর যুগ থেকে। খৃষ্টপূর্ব ৬শ বছর পূর্বের পাথরের গুটিকা (পুতি) দ্বারা নির্মিত মালাগুলো ছিল এক ধরণের সুতায় গাঁথা। পঁচে যাওয়া সুতা ছিল বুনো কার্পাস তুলা থেকে তৈরী। তাছাড়া প্রতœক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত পাথরের তৈরী রক্ষা কবজ রোগ বালাই থেকে রক্ষা করতে তখনকার মানুষ গলায় বেধে রাখত। এ থেকেও প্রমাণ হয় নব্যপ্রস্তর যুগেও নরসিংদীর প্রাচীন ভূমি রায়পুরা, বেলাব ও শিবপুরে সুতার প্রচলন ছিল বা সুতার ব্যবহার ছিল। এ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় নরসিংদী জেলার উত্তরাঞ্চলে গৌরিক মাটি দ্বারা গঠিত বেলাব, রায়পুরা ও শিবপুর এলাকাতে সুতার তৈরী কাপড়ের ব্যবহার শুরু হয় তা¤্র যুগ থেকে। (এ. কে ফজলুল হক)

আমাদের এই কাপড়ের গৌরবময় অধ্যায়ের কালিমা লেপন করে ইংরেজ সরকার।
“ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন থাকলে এ ঘটনা সম্ভব হত না, কিন্তু পরাধীনতার মূল্যস্বরূপ ভারতীয় স্বার্থকে ব্রিটিশ স্বার্থের যূপকাষ্ঠে বলি হতে হয়েছিল। ইংরেজ যে এদেশে এসে এখানকার পল্লী সমাজকে ধ্বংস করল, চরকা আর তাঁত ভেঙে দিল, তার কারণ শুধু ব্রিটেনের অর্থনীতি ব্যবস্থার একান্ত শ্রেষ্ঠত্ব নয়, একেবারে আইন করে এদেশের শিল্পকে শৃঙ্খলিত ও বিলুপ্ত করার মতো রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করেই ইংরেজ সফল হল। তাছাড়া ব্রিটেনের সমুন্নত অর্থনীতি যে ভারতবর্ষের লণ্ঠনলব্দ সম্পদ বিনা সম্ভব হত না।

১৮১৪ সালে বিলাত থেকে এদেশে সুতী কাপড় আমদানী হয়েছিল ১০ লক্ষ গজ, ১৮৩৫ সালে এল পাঁচ কোটি দশ লক্ষ গজ, এদেশ থেকে রপ্তানি ক্রমশ প্রায় বন্ধ হয়ে এল। ১৮১৫ থেকে ১৮৩২ সালের মধ্যে ভারতে প্রস্তুত সুতীকাপড় রপ্তানির দাম তেরো লক্ষ পাউন্ড থেকে কমে এসে ১ লক্ষ পাউন্ডেরও নীচে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক ঐ সময়ে বিলাতে তৈরী সুতীকাপড় আমদানী বেড়ে ২৬,০০০ পাউন্ড থেকে চার লক্ষ পাউন্ড হয়ে দাঁড়াল। তাঁতির অন্ন গেল, চরকা কাটা সুতার বাজার নষ্ট হল। ১৮১৮ থেকে ১৮৩৬ এর মধ্যে বিলাত থেকে এদেশে সুতার আমদানি বাড়ল ৫২০০ গুণ। যে ভারতবর্ষ পৃথিবীর সব দেশে সুতী কাপড় রপ্তানি করত, সেই তখন ব্রিটেনের মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য হল। সুতীকাপড় সম্বন্ধে যেমন, তেমনই রেশমী ও পশমী কাপড়, লোহ, কাঁচ, কাগজ চীনামাটির বাসন, সবদিক দিয়েই ভারতীয় শিল্পের সর্বনাশ ঘটল। ‘‘তাঁতী, কর্মকার, করে হাহাকার’’- এই হল সেদিনের সবচেয়ে সঠিক বর্ণনা। ১৮৯০ সালে সার হেনরী কটন ১৭৮৭ সালে ঢাকার কাপড় বিলেতে একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। চরকা কাটা আর তাঁত বোনা যুগ যেন নিঃশেষ হতে চলছিল। (ভারত বর্ষের ইতিহাস)
১৮৩৩ সালে ইংরেজরা এদেশে জমির মালিকানা নিয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালায়। নীল চাষে বাধ্য করে এদেশের কৃষি ও কৃষকের বারোটা বাজানোর প্রয়াস পায়। বিলেতে কাপড় ও পন্যে সামগ্রী ভারত বর্ষে ছেয়ে যায়। আবার সুদিন ফিরে এসেছে বাংলাদেশের ম্যানচেষ্টার মাধবদী বাবুরহাটে। নীল চাষে বাধ্য করা, বৃদ্ধাঙ্গুল কেটেও বাঙ্গালীদের দমাতে পারেনি। শুরু হয়েছে বস্ত্র বিপ্লব। এখন সঠিক দিক নির্দেশনা না পেলে, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব হলে আবার মসলিনের মত হতে পারে এ শিল্প।

লাইক দিয়ে শেয়ার করুন
0
Emdadul Islam Khokon

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *