নরসিংদীর মুক্তিযুদ্ধে এক্সপ্লোসিভ অপারেশন জিনারদি ক্যাম্প রেইডে এক্সপ্লোসিভ চার্জ

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে লেখাটি প্রকাশ করা হলো

ফকির আবুল কালাম আজাদ: ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ঘোড়াশাল ও নরসিংদীর মাঝখানে জিনারদি রেল স্টেশন। তৎকালীন কালীগঞ্জ থানার এক অংশ তথা বর্তমান পলাশ উপজেলা ও নরসিংদী সদর উপজেলার সঙ্গমস্থল বা বর্ডার এলাকা হলো জিনারদি রেল স্টেশন। স্টেশনের দক্ষিণ দিকে নরসিংদীর পাঁচদোনা ইউনিয়ন, পূর্ব দিকে চিনিশপুর ইউনিয়ন, উত্তর পাশে রেল লাইন ও বাজার এবং পলাশের জিনারদি ইউনিয়নের সীমানা শুরু।

জিনারদিতে পাক বাহিনীর একটা ক্যাম্প ছিল। স্টেশন প্ল্যাটফর্মের  উত্তর পাশ দিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে বয়ে গেছে যে রেল লাইন, সেটা টপকে পার হলেই ছোট্ট বাজার। সেই বাজারের ভেতর মোটামোটি আঁটঘাট বেঁধেই তারা বানিয়েছিল ক্যাম্প। ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেসের (EPCAF) সসশ্র সদস্যরা থাকতো সব সময় সেই ক্যাম্পে। আবার স্টেশনের পশ্চিম পাশে একটি ও পূর্ব পাশে দড়িপাড়ায় একটি রেল কালভার্ট ছিল – সেখানেও থাকতো তাদের সশস্র পাহারা।

দিনের বেলায় ট্রেনে ঘোড়াশাল ও নরসিংদী থেকে মাঝেমাঝে আসে পাঞ্জাবী-খান সেনারা। আশেপাশের এলাকায় তারা যখন-তখন চালায় লুটপাট। কৃষকের ধান-চাল, মুরগি-ছাগল-গরু, টাকা-পয়সা, যখন যা পায় তা-ই নেয় কেড়ে। ইচ্ছে হলেই বেধঢ়ক পেটায় মানুষকে।  চাপা ক্ষোভে গ্রামবাসী ফুঁসে ওঠে। কিন্তু অস্রের কাছে, অত্যাচারের ভয়ে, জীবন নাশের হুমকিতে তারা অসহায় হয়ে পড়ে।

একের পর এক এরকম  অভিযোগ আসতে থাকে নরসিংদী উপজেলার পাঁচদোনা ইউনিয়নের নেহাব গ্রামের দেওয়ান বাড়ি পাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের নিবেদিত সংগঠক  আব্দুল মালেক মেম্বারের বাড়িতে, মুক্তিবাহিনীর থানা কমান্ডার মুহম্মদ ইমাম উদ্দিনের  ক্যাম্পে। তখন এটাই ছিল নরসিংদী, শিবপুর, আড়াইহাজার ও রুপগঞ্জ থানার মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত দুই নম্বর সেক্টরের ইউনিট-১ এর হেড কোয়ার্টার, ন্যাভাল সিরাজ যে ইউনিটের কমান্ডার।

নেহাব এমন একটি গ্রাম যা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অত্যন্ত শক্ত ঘাটি। এখানে তাদের একটি ক্যাম্প ছিল –  আর একটু বর্ননা না  দিলে, শুধু এই একটি বাক্যে, তখনকার গ্রামের প্রকৃত চিত্র বা মর্ম আজ অনেকেই অনুধাবন করতে পারবেন না। আসলে এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন ছিল এক একটি ক্যাম্প, দূর-দূরান্তের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের একান্ত নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি পাড়ায় যেন ছিল অতন্দ্র মুক্তিযোদ্ধা। প্রতিটি মানুষ যেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, যেকোনো মুক্তিযোদ্ধার বিশ্বস্ত গাইড। দিনে-দুপুরে কিংবা রাত-বিরোতে যখন তখন   ডাক দিলেও তারা জড়ো হয়ে যেতো যুদ্ধের উন্মাদনায়। সে এক বিস্ময়কর সময়। যুদ্ধের মাতাল হাওয়ায় বিভোর গ্রামের মানুষ, মনে হয় এমন কি, আকাশ-বাতাস, ঘর-বাড়ি, গাছ-গাছালি, লতা-পাতা, ঝোপঝাড় সব কিছু।

একদিন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে শুভান্যুধায়ীদের মাধ্যমে বাতাসের গতিতে খবর রটে গেল যে,মূলপাড়া-টেংরারটেক-চাকশাল হয়ে খালদরিয়ার সড়কের দিকে হেঁটে এগিয়ে আসছে একটি খাকি পোষাকের সশস্র দল। সবাই ভাবলো এবার বুঝি পাক সেনারা নেহাব গ্রাম আক্রমণ করতে আসছে। ইউনিট কমান্ডার ন্যাভাল সিরাজ সেদিন গ্রামে নেই। থানা কমান্ডার মুহম্মদ ইমাম উদ্দিনের সামনে কঠিন প্রশ্ন-তাদের প্রতিহত করা হবে কিনা। তিনি তাৎক্ষণিক আবদুল হাকিম, সুলতান আহমেদসহ অন্যান্য নেতৃস্থানীয় সহযোদ্ধাদের আহবান করলেন দ্রুত পরামর্শের জন্য।  স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্থ গৃহীত হলো প্রতিহত করার। সঙ্গে সঙ্গে ইমাম নির্দেশ দিলেন সবাইকে যথাসম্ভব সড়কের নিকটবর্তী সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে অবস্থান গ্রহন করার জন্য।

সেই অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন স্থানে পজিশন নিয়ে কমান্ডারের আদেশে শত্রুর প্রতি চালালো আক্রমণ। বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে ছুটে আসা গুলির বেকায়দা আঘাত ও শব্দে ভীষণ ভড়কে গেল খাকি পোষাকওলারা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চললো পাল্টা গোলাগুলি।

খালদরিয়ার পুলহীন খালে তখন গহীন পানি, নদীর মতো স্রোত, খালের দুই পাড়ে মাটি কামড়ে আছে কেবল কিছু ইট-সিমেন্টের আস্তর, যা স্মরণ করিয়ে দেয় কোনো এক কালের ব্রিজের অস্তিত্ব।  ভাঙ্গা পুলের এই খাল পার না হয়ে জিনারদি থেকে নেহাব গ্রামে হেঁটে আসার সাধ্যি ছিল না কারো। প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা খাল পার হয়ে কিছুতেই আগে বাড়তে পারছিল না।

এদিকে আকাশে দিনের আলো কমে গেছে, সন্ধ্যাও ঘনিয়ে আসছে। উপায়ন্তর না দেখে খাকী পোষাকের দল তড়িঘড়ি ভাগার পাঁয়তারা করলো। তারা নৌকা যোগাড় করে বিল পার হয়ে ভাগদী গ্রামে নেমে ঘোড়াশালের দিকে পালিয়ে চলে গেল| (অসমাপ্ত) ।

…………………………..

লাইক দিয়ে শেয়ার করুন
0
madhabdi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *