পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প

খন্দকার  শাহিন, মাধবদী ওয়েব ডটকম: যুগ যুগ পূর্বে গা-গ্রামে এমনকি শহরে বন্দরে ঝুড়িতে ফেরি করে মাটির তৈরী জিনিসপত্র বিক্রি করা হতো। আর এ মাটির তৈরীর মৃৎশিল্পের কারুকাজের ব্যাপক সুনাম অর্জন করে নরসিংদী জেলা মৃৎশিল্পীরা। আজ কালের বিবর্তন আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এ মৃৎশিল্প। তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও বিকল্প পণ্যের ভিরে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির তৈরি এসব সামগ্রী। ফলে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছেন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারদের।

সরেজমিন মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশব্যাপী নরসিংদী জেলার মৃৎ শিল্পের খুব চাহিদা ছিল। জেলার শিবপুর, পলাশ ও বেলাবো উপজেলার হাজারো পাল পরিবার জড়িত ছিল এ শিল্পের সঙ্গে। এ জেলার মৃৎ শিল্পীদের হাতে তৈরি মাটির জিনিসপত্র নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু দিনের পর দিন আধুনিকতার ছোঁয়া আর পৃষ্ঠপোষতকার অভাবে বিলীন হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প। কমদামে বেশি টেকসই প্লাস্টিক, মেলামাইন, লোহা ও সিলভারের তৈরি সামগ্রীর দাপটে কমে গেছে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা। ফলে পুঁজি ও শ্রম দিয়ে মাটির তৈরি জিনিস বানাতে গিয়ে অনেকটা মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে মৃৎশিল্পীদের।

মাটি দিয়ে তৈরি এসব গৃহসামগ্রী রোদে শুকিয়ে চুল্লিতে পোড়ানো হয়, তার পর রং করে বিক্রির উপযোগী করা হয়। বাড়ির গৃহিনীরাও সহযোগিতা করেন এসব কাজে। মৃৎ শিল্পীরা বলছেন পরিশ্রম ও বিনিয়োগ অনুপাতে পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান না তারা। এ কারণে পুরনো পেশার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকেই, খুঁজছেন বিকল্প পেশা। জেলার বেলাব, পলাশ ও শিবপুর উপজেলার হাজারো পাল পরিবারের মধ্যে এখন মাত্র আড়াই শতাধিক পরিবার ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের এ পেশা। পাল পরিবারের নতুন প্রজন্মের কেউ শিখছেন না মৃৎ শিল্পের কাজ।

শিবপুর উপজেলার লেটাবর গ্রামের মৃৎশিল্পী মনিন্দ্র চন্দ্র পাল বলেন, তৈজসপত্র তৈরির জন্য এখন মাটি কিনে আনতে হয়। কেনা মাটি দিয়ে তৈরি জিনিসপত্রের খরচও বেশি পড়ে। এ যুগে বেশি মূল্যে এসব জিনিস কিনতে আগ্রহ দেখান না ক্রেতারা। এতে আমাদের লোকসান গুনতে হয়।

একই গ্রামের সুনীল চন্দ্র পাল বলেন, আমাদের সন্তানরা মাটির কাজ শিখতে চায় না। তারা অন্য পেশায় নিযুক্ত হচ্ছে। আমরা যারা আছি অন্য কোনও কাজ না জানার কারণে ঐতিহ্যবাহী ধরে রাখতে লেগে আছি।

যোশর গ্রামের মৃৎশিল্পী শশী চন্দ্র পাল বলেন, মৃৎশিল্পীরা বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিপাকে থাকেন বছরের পর বছর ধরে। আমাদের এটাকে শিল্প বলা হলেও সরকারিভাবে কোন ঋণের সুবিধা পাই না। পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ পাওয়া গেলে খেলনা, শোপিসসহ অন্যান্য সৌখিন জিনিস তৈরি করে মৃৎ শিল্পীরা বেঁচে থাকতে পারতো, এই শিল্পের ঐতিহ্যও রক্ষা করা যেতো।

এ ব্যাপারে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, মৃৎ শিল্পীদের সমস্যাটা আমার জানা ছিল না, কেউ আমারে কাছে আসেওনি। আমি যেহেতু এখন জানতে পারলাম, চেষ্টা করবো ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচাতে মৃৎ শিল্পীদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার। পাশাপাশি সরকারি সংস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে প্রয়োজনীয় ঋণ সহযোগিতা দেওয়ার।

লাইক দিয়ে শেয়ার করুন
0
madhabdi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *