আলগী গ্রামের সুরেন্দ্র মোহন পঞ্চতীর্থ: অজানা কথা

এমদাদুল ইসলাম খোকন: পবিত্র কোরআন শরীফের প্রথম বাংলা অনুবাদকারী ভাই গিরিশ সেন, কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত,  মাধবদীর বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বীর অকুতোভয় সৈনিক সতীশ পাকড়াশীর নাম অনেকেই জানেন এবং তাদের সমন্ধে কমবেশী অবগত আছেন কিন্তু সুরেন্দ্র মোহন ভট্টচার্য যিনি সংস্কৃতি পন্ডিত, সনাতন ধর্মাবলম্বি, ধর্মগুরু যিনি ২৬টি বই লিখেছেন। ইতিহাস নির্ভর আকর গ্রন্থ ‘মহেশ্বরদীর ইতিহাস’ রচনা করে নরসিংদী বাসীকে চিরঋনী করেছেন- বর্তমান প্রজন্ম তার নাম পর্যন্ত জানেন না। স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে যাদের আগ্রহ প্রচুর তাদের কাছে উক্ত বইটি আবশ্যই তথ্যবহুল। তার দেখানো পক্ষেই হাটছি আমরা। আসলে তার সমন্ধে জানা, তার জীবনচরিত্র ফুটিয়ে তোলা কঠিন। তার বংশের এখন কেউ নেই যিনি এ ব্যাপারে সাহায্য সহযোগিতা করতে পারেন। তবু কয়েকদিন তারিনী ভূঞা বাড়ী সংলগ্ন ঠাকুর পাড়ায় আসা যাওয়া করে কিছু অসম্পুর্ন তথ্য সংগ্রহ করেছি। শিক্ষার আলো বিতরণ, এ পরগনার ইতিহাস তুলে ধরা, মানবতাবোধ সৃষ্টিতে নিরলস পরিশ্রম করা- এই সব কারণে সুরেন্দ্র মোহান ভট্টাচার্য্যকে নরসিংদী বাসী বার বার মনে করবে। আলগীর ঠাকুর পাড়ার সুরেন্দ্র মোহান ভট্টাচার্য্য, হেম চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, এই এলাকাকে তুলে ধরতে – আজকের এই পর্যন্ত বেড়ে ওঠার পিছনে আগাছা পরিস্কার করে পথ চিহ্নিত করে গেছেন। তবে বলতে দ্বিধা নেই, সুরেন্দ্র মোহানরা অনেকটাই এখনো অজানা।
সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য্য পঞ্চতীর্থ এম এ ছিলেন অধ্যাপক। ব্যাকরণবিদ, সংস্কৃতি পন্ডিত হিসাবেও তার সুনাম যশ রয়েছে। সুরেন্দ্র মোহান ভট্টাচার্য্য চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। অপর তিন ভাই হলেন হেম চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, মনিন্দ্র ভট্টাচার্য্য, যতিন্দ্র ভট্টাচার্য্য। হেম ভট্টাচার্য্যের ছেলে বাণী কণ্ঠ ভট্টাচার্য্য ও বিষু ভট্টাচার্য্য। এখানে উল্লেখ্য বাণী ভট্টাচার্য্য ও বিষু ভট্টাচার্য্য ছিলেন বৈমাত্রিক ভাই। এর পূর্বে আমি আমার এক লেখায় বাণীকণ্ঠ ভট্টাচার্যকে বিষু ভট্টাচার্য বলে উল্লেখ করেছিলাম। আসলে তারা দুই ভাই। বিষু কর্তার আরেক নাম দেবকণ্ঠ ভট্টাচার্য্য, যিনি মহেশ্বরদী পরগনা বইয়ের প্রকাশক। বৃটিশ শাসনের শেষ ভাগে (১৯০০-১৯০৫) আলগী গ্রামের ভূস্বামী বাণী কণ্ঠ ভট্টাচার্য্য বিলেত থেকে সর্ব প্রথম সম্পুর্ন লোহার তৈরি উন্নতমানের তাঁত আমদানী করেন। এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য সহযোগিতা বাবা হেম ভট্টাচার্য্য। তিনি ছিলেন স্কুল শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মাধবদীতে মাক্কু ও তাঁত যন্ত্রপাতির ব্যবসা করতেন। হেম চন্দ্রের পাশাপাশি  আলগী গ্রামের তারিনী ভূঞার ছেলে সতী প্রশন্ন ভৌমিকও এ তাঁত কলের মাক্কু ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতেন।  তারা ছিলেন এক্সপোর্ট ইম্পোটার। কেউ কেউ মনে করে আলগী নিবাসী মৃত্যুঞ্জয় নাথ শ্বশুর বাড়ী থেকে একটি লোহার তাঁত এনে চালু করেন, এরপর ছড়িয়ে পড়ে নাথ সম্প্রদায়ের মধ্যে। মৃত্যুঞ্জয় নাথ ও বাণী কণ্ঠ ভট্টাচার্য্য , তারিনী ভূঞা  তারাই আধুনিক বস্ত্রশিল্পের পথিকৃত। তবে শুনা যায় এর পূর্বে ডাঃ বিপিন পালের (ঠেলা পাল) একটি লোহার তাঁত ছিল। আস্তে আস্তে আলগীর প্রান্তর আলী মুন্সী, দৌলত মাষ্টার, রশিদ ভূইয়া, রজব আলী , বিবিরকান্দীর আঃ গণী, আঃ ছামাদ বেপারী, ডৌকাদির তালেব আলী, কান্দাপাড়ার কেরামত আলী ও খেজমত আলী প্রমুখ ব্যক্তি বর্গ এ তাঁত চালু করেন। এ অভিনব তাঁত এলাকায় ‘বিলেতী কল’ বা ‘লোহার কল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
বাণী কন্ঠ ও বিষু ভট্টাচার্য বিলেত থেকে মেশিনারী মালামাল আমদানী করতেন। মাধবদীতে অনেক ভিটি (ঘর) ছিল তাদের। বিষু ভট্টাচার্য্যকে ‘বিষু কর্তা’ হিসেবে সবাই মান্য করতেন। বাণী কণ্ঠ পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে ভারত চলে যান। সে সাথে তার ভাই ভাতিজারা ও ভারতে চলে যান। বিষু কর্তা থেকে যান বাংলাদেশে। মাধবদী বাজারেই ছিল তাদের ব্যবসা। এরশাদ শাসনামলে শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা কারণে বিষু কর্তা ভারতে ২৪ পরগণা “খরদে” স্থায়ীভবে বসবাস শুরু করেন। তিনি বৃদ্ধ বয়সে গত বছর মাধবদী আলগীতে এসেছিলেন। তার তিন ছেলে উজ্জল, উৎপল, চঞ্চল, সজল ও মেয়ে সাথী এখনো জীবিত। বিষু কর্তা জীবিত থাকলে সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য সমন্ধে বিস্তারিত জানা যেতো। কারণ তিনি ছিলেন তার ভাতিজা। তবে বর্তমানে নান্টু চক্রবর্তী নামে একজন তাদের বংশধর বর্তমানে ঠাকুর পাড়ায় বসবাস করেন। তারা বাবার নাম গোপাল চক্রবর্তী। সুরেন্দ্র মোহনের সাথে তার সম্পর্ক ছিল দুর সম্পর্কীয় মামা ভাগিনার।
নান্টু ভট্টচার্য বর্তমান পূর্জা অর্চনা করে সময় কাঠান। পুরোহিত হিসেবে তাকে বিভিন্ন জায়াগায যেতে হয়।
সুরেন্দ্র মোহান সম্বন্ধে তত বেশি জানেন না। তখন তিনি খুব ছোট, সুরেন্দ্র মোহন ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। কালেভদ্রে আলগী আসতেন। নান্টু চক্রবর্তী সাথে আলাপচারিতায় কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন:  সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্যের পেশা সম্বন্ধে কিছু বলেন,

উত্তর: উনি ছিলেন সংস্কৃতি ভাষার পন্ডিত। তিনি তৎকালিন রেডিও পাকিস্তানের গীতা, চন্ডি ও অন্যান্ন বিষয়ে উপস্থাপনা করতেন। এছাড়া তিনি ছিলেন ধর্ম শ্বাস্ত্রীয় লেখক। তাকে পঞ্চতীর্থ, কাব্যতীর্থ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ঢাকা প্রগ্রোজ স্কুলে সংস্কৃতি ভাষার পন্ডিত ছিলেন।

প্রশ্ন: সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য্যের কয় ছেলে মেয়ে?

উত্তর: আমার সঠিক মনে নেই তবে সম্ভবত তার পাঁচ ছেলে-মেয়ে। সুখেন্দ্র, শিবেন্দ্র, রথীন্দ্র ভট্টাচার্য্য ও তাদের দুই বোনের নাম জানিনা।

প্রশ্ন: সুরেন্দ্র মোহন ভট্টাচার্যের শারিরিক গঠন সম্পর্কে কিছু বলেন।

উত্তর: তিনি ছিলেন বিশাল দেহের অধিকারী। গায়ের রং ছিল ফর্সা, মুখে ছিল লম্বা দাড়ি। ব্যবহার ছিল অমায়িক। ঢাকা থেকে আলগী এলে সবার সাথে দেখা সাক্ষাত করতেন, কুশল বিনিময় করতেন।

প্রশ্ন:  সুরেন্দ্র মোহন এর ভাইয়ের সম্বন্ধে কিছু বলেন।

উত্তর: তার ভাই মনিন্দ্র ভট্টাচার্যও ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কলেজে অধ্যাপনাও করতেন।

প্রশ্ন: ঠাকুরপাড়া অর্থাৎ সুরেন্দ্র মোহান ভট্টাচার্যের পড়শি ছিল কারা কারা?

উত্তর: তিনি তখন ঢাকায়। বিষু কর্তা থাকেন মাধবদী বাজারে ব্যবসা করতেন। তাদের বাড়ীর পাশে ছিল কালীকান্ত চক্রবর্তী। তিনিও ছিলেন অনেক ভূ সম্পত্তির মালিক।  গীর্জা কান্ত ও নিশি কান্ড নামে তার দুই ছেলে ছিল উচ্চ শিক্ষিত। তারা মাধবদী হাইস্কুলে ও বালাপুর স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।

প্রশ্ন: মহেশ্বরদী পরগনা নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন, তা জানেন?

উত্তর: হ্যাঁ জানি, তবে পড়ি নি।

প্রশ্ন : তিনি কোথায় মারা যান।

উত্তর:  তিনি ঢাকাতেই মৃত্যু বরণ করেন।

লাইক দিয়ে শেয়ার করুন
0
madhabdi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *